ভারতে রাশিয়ার তেল বিক্রির নতুন রেকর্ড

ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে মস্কোর বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া থেকে সস্তায় অপরিশোধিত তেল কেনার নতুন আরেকটি রেকর্ড গড়েছে ভারত। কেবল গত মে মাসে দেশটি রাশিয়ার কাছ থেকে যে পরিমাণ তেল আমদানি করেছে, তা সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা মোট তেলের চেয়েও বেশি। রোববার ভর্টেক্সারের প্রাথমিক জ্বালানি কার্গো-ট্র্যাকিং ডাটার বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে পিটিআই। ভর্টেক্সারের মতে, ভারত গত মে মাসে রাশিয়া থেকে প্রতিদিন ১৯ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছে; যা এপ্রিলের সর্বোচ্চ আমদানির তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। মে মাসে ভারতের আমদানি করা মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৪২ শতাংশই এসেছে রাশিয়া থেকে। ভারতের গত কয়েক বছরে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের এই পরিমাণ একক কোনো দেশ থেকে সর্বোচ্চ। সস্তায় রাশিয়ার অপরিশধিত জ্বালানি ক্রয়ের সুবিধা ভারতীয় পরিশোধনকারীদেরও উৎপাদন ও মুনাফা বৃদ্ধি করেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইউরোপে পরিশোধিত জ্বালানির রপ্তানি এবং বাজারে হিস্যা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ভারতে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি বৃদ্ধির খেসারত দিতে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত সরবরাহকারীদেরও। ভর্টেক্সারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সৌদি আরব থেকে ভারতের তেল আমদানির পরিমাণ ৫ লাখ ৬০ হাজার টনে নেমে এসেছে; যা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন। পাশাপাশি ভারতের তেল আমদানির হিসাবে শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের হিস্যাও মে মাসে সর্বকালের সর্বনিম্ন ৩৯ শতাংশে নেমেছে। অতীতে ভারতের আমদানি করা সব অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আসতো ওপেকের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে। কিন্তু গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে মস্কোর আগ্রাসনের পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমাদের কাছে তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সস্তায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে তেল বিক্রির প্রস্তাব দেয় রাশিয়া। তখন থেকে ভারতে ওপেকের তেল রপ্তানি কমতে শুরু করে, যা এখন সর্বকালের সর্বনিম্নে নেমেছে। ভর্টেক্সার বলছে, টানা অষ্টম মাসের মতো ভারতে অপরিশোধিত তেলের একক বৃহত্তম সরবরাহকারী রয়েছে রাশিয়া। বর্তমানে ভারতের আমদানি করা মোট তেলের প্রায় ৪২ শতাংশই রাশিয়ান। ভারতের শোধনাগারগুলোতে পেট্রোল ও ডিজেলে রূপান্তরিত করা হয় রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল। শিপিং ডাটা বিশ্লেষণকারী এই প্রতিষ্ঠান বলেছে, গত দশকে ভারতের বৃহত্তম সরবরাহকারী ইরাক ও সৌদি আরবের কাছ থেকে কেনা মোট তেলের চেয়েও বর্তমানে নয়াদিল্লি বেশি পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করছে রাশিয়া থেকে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত মে মাসে ইরাক থেকে ভারত গড়ে প্রত্যেক দিন প্রায় শূন্য দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত গড়ে দৈনিক ২ লাখ ৩ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে ভারতে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ১ লাখ ৩৮ হাজার ব্যারেল। গত বছরের সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরু হওয়ার আগে ভারতের বাজারে রাশিয়ার তেল রপ্তানির হিস্যা ছিল ১ শতাংশেরও কম। কিন্তু গত মে মাসে ভারতের বাজারে রাশিয়ার তেল রপ্তানির হিস্যা ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। মে মাসে দৈনিক গড়ে ১৯ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল রাশিয়ান তেল আমদানি করেছে ভারত। ভরটেক্সা বলছে, ভারত মে মাসে দৈনিক গড়ে ৪৭ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করলেও এরমধ্যে ওপেক সরবরাহ করেছে মাত্র ১৮ লাখ ব্যারেল। যা গত এপ্রিলে আমদানি করা ২১ লাখ ব্যারেলের তুলনায় কম। ভরটেক্সার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মে মাসে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের কেনা তেলের পরিমাণ ইরাকের কাছ থেকে আমদানি করা তেলের দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। অথচ ২০১৭-১৮ সাল থেকে ভারতে শীর্ষ তেলের সরবরাহকারী ছিল ইরাক। একইভাবে ভারতে তেল সরবরাহে পতন ঘটেছে সৌদি আরবেরও। বর্তমানে দেশটি ভারতে তেল রপ্তানিতে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে। ভারতীয় পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের কারণে অতীতে অত্যন্ত কম পরিমাণে রাশিয়ার তেল ক্রয় করত। কিন্তু বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় মস্কোর জ্বালানি রপ্তানি ধাক্কা খেয়েছে। যে কারণে মস্কো এখন পশ্চিমাদের বাইরে বিভিন্ন দেশের কাছে সস্তায় বিভিন্ন গ্রেডের তেল বিক্রি করছে। এই সুযোগ নিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের কাছে আবার তা বিক্রি করছে ভারত।