নারী নির্যাতনের ঘটনায় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের উপ-সচিব মো. দিদারুল আলম চৌধুরীর পদোন্নতির সঙ্গে তার সম্পত্তিও বেড়েছে। গত ৩৬ বছরে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে তিনি। অনিয়ম ও দুনীতি করে পার পেলেও নারী নির্যাতন মামলায় তাকে জেল হাজতে যেতে হয়েছে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রাণিত হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সংসদ সচিবালয়।
নারী নির্যাতন সংক্রান্ত দুটি মামলার বিচারকার্য চলার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংসদ সচিবালয়।সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নোয়াখালী জেলার সদর উপজেলার সাদপুর গ্রামের এনায়েত উল্ল্যাহর পুত্র মো. দিদারুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কাকারির অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। অসংখ্য নারীর সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক থাকলেও স্ত্রী চারজন। এর মধ্যে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আইনগত ভাবে ছাড়াছাড়ি হলেও দ্বিতীয় স্ত্রীকে না জানিয়ে তিনি আবারও বিয়ে করায় চলতি বছরের শুরুতে পারিবারিক বিরোধ তৈরি হয়।
যা পারিবারিক সহিংসতায় রূপ নেয়। যে কারণে দিদারুল আলমের তৃতীয় স্ত্রী বাদি হয়ে বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলা দায়ের করেন।ওই টাইব্যুনাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১ (গ) ধারায় দায়েরকৃত ওই মামলাটি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে জুডিশিয়ালী তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় গত ৪ জুন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
পরদিন ৫ জুন দিদারুল আলম আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিনের আবেদন করলে আদালত জামিন না মঞ্জুর করে তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।বাদি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনোয়ার হোসেন আলম স্পিকার বরাবর এক লিখিত আবেদনে উক্ত ঘটনার উল্লেখ করে মো. দিদারুল আলম চৌধুরীকে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ৩৯ (২) ধারা মোতাবেক তাকে সংসদ সচিবালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার ও বিভাগীয় মামলা দায়েরের অনুরোধ জানান। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৩ জুন এক চিঠিকে উপ-সচিব মো. দিদারুল আলম চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মাহবুব জামিল। তিনি বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা ও স্পিকারের আদেশক্রমে ওই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

আর বিভাগীয় মামলার বিষয়টি শৃঙ্খলা কমিটি দেখছে।’এদিকে সংসদ সচিবালয় থেকে সাময়িক বরখাস্ত হলেও গত ২৫ জুন জামিনে ছাড়া পান দিদারুল আলম চৌধুরী। জেল থেকে বেরিয়েই তিনি বাদিকে নানাভাবে হয়রানি করছেন। এমনকি জীবন নাশের হুমকি দিচ্ছেন। এ বিষয়ে শেরে বাংলা নগর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন তার তৃতীয় স্ত্রী। অন্যদিকে সংসদ সচিবালয় ও দুদকের পক্ষ থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতি অভিযোগগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। আর এই তদন্ত ও মামলার কার্যক্রম চলাকালে গত ২৯ মার্চ উপ-সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। তিনি ১৯৮৬ সালে সংসদ সচিবালয়ে যোগদান করেন।উপ-সচিব মো. দিদারুল আলম চৌধুরী সরকারি বাসা বরাদ্দ নিলেও চতুর্থ স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবীনগর আবাসিক এলাকার ১৪ নম্বর সড়কের ৯৯ নম্বর বাসায়। সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন ছাড়াই তৈরিকৃত ওই সাত তলা ভবনের মালিক তিনি নিজেই। রাজধানীর সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় তার ৬.৫ শতাংশ জমি রয়েছে। মিরপুর হাউজিং এস্টেটের ৯ নম্বর সেকশনের স্বপ্ননগর আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্পে এক হাজার ৫৪৫ বর্গফুট আয়তনের (সিড়ি, লবি ও লিফটসহ) ইমারত নম্বর-১ এর এ/১ নম্বর ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। এছাড়াও প্রাইভেট কার, রূপায়ন সিটিতে ফ্ল্যাট, আগারগাঁও বিএনপি বাজারে দোকান, ভাকুর্তায় জমি, সাভারে শাপলা হাউজিং-এ জমিসহ নামে বেনামে আরো সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে।

উপ-সচিব মো. দিদারুল আলম চৌধুরী সরকারী পদমর্যাদা ব্যবহার করে টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেন। সুমী এন্টারপ্রাইজ, ২০১ দক্ষিণ গোড়ান, ঢাকা, মেসার্স মডার্ণ এন্টারপ্রাইজ, ১০৬/১০৬ নম্বর আগারগাঁও বাজার, ঢাকা এবং মেসার্স এম. এ. তামান্না ট্রেডার্স, ২৭৪ পশ্চিম আগারগাঁও বাজার, ঢাকা-এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। অন্যের নামে পরিচালিত ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সংসদ সচিবালয়সহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টেণ্ডার বাণিজ্য করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন ওষুধ কম্পানির কাছ থেকে নগদ অর্থসহ নানা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে দিদারুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। তিনি কমিটি অফিসার হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দায়িত্বে থাকাকালে ওই অভিযোগ ওঠে। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে দেশে তৈরি ওষুধের মান পরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশের ৮৪টি ওষুধ কম্পানির কারখানা সরেজমিন পরিদর্শন শেষে তদন্ত রিপোর্ট পেশ করেন। আর তদন্ত চলাকালে ও পরবর্তী সময়ে কম্পানিগুলোর সঙ্গে দেন-দরবার চলে ওই কর্মকর্তার। ওষুধ কম্পানির সঙ্গে তার সোনালী ব্যাংকের সংসদ ভবন শাখার একাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হয়। যে একাউন্টটি তার স্ত্রীর নামে।

অপর এক অভিযোগে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে সংসদ সচিবালয় থেকে ছুটি না নিয়ে জার্মানি চলে যান দিদারুল আলম চৌধুরী। প্রায় ৯ মাস পর নারী ঘটিত কেলেঙ্কারির কারণে জার্মান সরকার তাকে দেশে ফেরত পাঠায়। দেশে এসে তিনি পুনরায় চাকরিতে যোগদান করেন। সে সময় অফিসে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলে প্রতারণার মাধ্যমে চাকরিতে বহাল হন। তখন তিনি ‘বিদেশে যাননি, দেশে ছিলেন’ বলে দাবি করলেও ওই সময়ের পাসপোর্টে জার্মানির ভিসা রয়েছে। যে পাসপোর্টটিতে পেশা হিসেবে প্রাইভেট সার্ভিস উল্লেখ করা হয়েছে।

আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপ-সচিব দিদারুল আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সাময়িক বরখাস্তের খবর জেনেছি। কিন্তু বিভাগীয় মামলা হয়েছে কিনা, বা দুদক কোনো তদন্ত করছে কিনা তা আমি জানি না। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। আমাকে অন্ধকারে রেখে সবকিছু করা হয়েছে। আমার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর সে ক্ষিপ্ত হয়ে এসব কিছু করছে। গত ১৬ জানুয়ারি তাকে তালাক দিয়েছি। আর এই সকল মামলা তার পরের।’

তিনি আরো বলেন, ‘সকল সম্পদ একত্রে করে বহু বছর আগে মোহাম্মদপুরে একটি জমি কিনেছিলাম। যেখানে জলাশয় ছিল। সেখানে এখন একটি বাড়ি করছি। সেটা স্ত্রী ও মেয়েদের নামে লিখে দিলে কিছুই হতো না। কিন্তু আমার তো ছেলেও আছে। লিখে না দেওয়ার কারণে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওই মহিলা সবকিছু করছে।’        সূত্র: কালের কন্ঠ