গণপরিবহনকে সমন্বিত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব রূপে গড়ে তুলতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি জনবান্ধব গণপরিব্যবস্থা চালু, নারীদের জন্য পৃথক বাস সেবা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মনোরেল চালুর পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাই রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সোমবার সচিবালয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সার্বিক গণপরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে এক বৈঠকে এই নির্দেশনা দেন তিনি।
এ সময় সড়ক, রেল ও নৌ-মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল হক উপস্থিত ছিলন। বৈঠকে মেট্রোরেলের পাশাপাশি লাইট রেল, মনোরেল, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও সাধারণ বাস-সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন সাংবাদিকদের জানান, রাজধানীতে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সড়ক পরিবহনের অবস্থা মন্ত্রীর কাছ থেকে জেনেছেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী রাজধানীতে নারী বাস সার্ভিস চালু করার জন্য মন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলের সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ ঈদের আগেই শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীকে।
গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলার নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করতে চান বলে জানিয়েছেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
অধ্যাপক মো. শামসুল হক বলেন, আমি বুঝতে পারি যে পরিবহন একটা বড় সমস্যা। এটাকে আমাদের সমাধান করতেই হবে। জনগণের জন্য জনবান্ধব একটা পরিবহন ব্যবস্থা দিতে হবে। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যেহেতু ১৬ বছর লন্ডনে ছিলেন, গণপরিবহনটা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আমরা দুই ঘণ্টা এটা নিয়েই কথা বলেছি। তিনি খুব আহত হন যখন জনগণের গণপরিবহনের এক্সেসটা দেখেন খুব সীমিত। পার্টিকুলারলি ফিমেল যারা আছে, তাদের প্রাইভেসি ইস্যু হচ্ছে, তারা ভালো কোনো গণপরিবহন পাচ্ছে না, সেফটি-সিকিউরিটি নেই। কী করা যায়, এই কী করার ভাবনা থেকেই তিনি আমার সাথে কথা বলেন।
বিশেষ করে গণপরিবহনের সর্বোৎকৃষ্ট যে মাধ্যম মেট্রো, এর বাইরেও আরও কিছু করা যায় কি না, যেটা তিনি অলরেডি বলেছেন- মনোরেল যেহেতু সাশ্রয়ী মূল্যে খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়।’ তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ দেখলাম গণপরিবহনটাকে সুশৃঙ্খল করা। এটা করতে গিয়ে যা যা করতে হয় মেট্রো মেট্রোর জায়গায় হবে কিন্তু এটা যেন সমন্বিতভাবে অন্যান্য মেট্রো সংস্করণগুলো আছে সেগুলোর সঙ্গে যেন সমন্বিত হয় সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মনোরেল
চালুর নির্দেশনা
ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত এলাকায় গণপরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণে লাইট রেল ও মনোরেল চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগ্রহ প্রকাশ করেছেন জানিয়েছেন অধ্যাপক সামছুুল হক। তিনি বলেন, প্রায় আট-নয় মাস আগে তারেক রহমান নিজে থেকেই গণপরিবহন খাত সংস্কারের বিষয়ে আগ্রহ দেখান। নিরাপদ বাসসেবা চালু করা। নারীদের জন্য বিশেষায়িত বাস, যেখানে নারীচালক নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, তা দ্রুত চালুর বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়েছে। বাস, নারীরাই চালাবে এবং সবচেয়ে বড় আগ্রহটা দেখলাম, খুব ভালো লেগেছে- তিনি ইলেকট্রিফিকেশন বাস দিয়েই আরম্ভ করতে চাচ্ছেন। উনিও চাচ্ছেন খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ইলেকট্রিক বাসভিত্তিক গণপরিবহন প্রথমেই, বিশেষ করে নারীদের জন্য, এইটা করার জন্য্রহ তার।’
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, ‘পূর্ব দিকের বাসাবো, গোরান, মাদারটেক, পুরানো টাউনে বিপুল জনগোষ্ঠী বাস করে। তারা কিন্তু ইভেন বাসও পায় না। মেট্রোগুলো সাধারণত প্রধান সড়কগুলোর ওপর দিয়ে গেছে। সো এটাকে যদি মেট্রোর বাইরে অন্য কোনো সংস্করণে আনা যায়, মেট্রো তো একটা না, আমরা একটা চিনেছি মেট্রো, কিন্তু ভারী মেট্রো। এটার যেমন দরকার আছে, ব্রডব্যান্ড কানেকশনের পাশাপাশি, কিন্তু লাইট রেলও দরকার আছে, মনোরেল দরকার আছে, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি দরকার আছে, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) দরকার আছে, এবং অর্ডিনারি বাস- সবকিছুই দরকার। কিন্তু, রেগুলেটেড হতে হবে। ঘিঞ্জি এলাকা যেখানে মেট্রো যাবে না, মেট্রোকে সাপ্লিমেন্ট করার জন্য আর কি করতে পারি, সেটার একটা স্টাডি করে তাকে (প্রধানমন্ত্রী) একটা প্রস্তাব দেওয়া, যেন তারা এই বছর কাজ আরম্ভ করতে পারেন।’
ঢাকা-চট্টগ্রামে হাইস্পিড ট্রেন
চালুর পরামর্শ
অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলছেন আমাদের বাসগুলো অত্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল, বিশৃঙ্খল। এটাকে সুশৃঙ্খল করতে গেলে যা যা করণীয়, আরম্ভ করি না? আমরা পাইলটিং করে, জোন করে আরম্ভ করি। কম বিনিয়োগে বেশি মানুষকে কভারেজ দেওয়ার ব্যাপারে তার আগ্রহ। আমি যখন বললাম- এটার জন্য উন্নয়ন যন্ত্রণাটা একটু কম হয়। আপনি স্টিলের যদি পিয়ার বানান, এইটাকে আপনি প্রিফ্যাব্রিকেটেড করে এখানে ইনস্টল করবেন- তাহলে এই ঘিঞ্জি এলাকায় উন্নয়নের পেইনটাও কম হবে। পুরো ঢাকার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় রেলভিত্তিক গণপরিবহনে যাওয়া যাবে। আর ঢাকাকে ডিসেন্ট্রালাইজ করার ব্যাপারেও কিন্তু তার বড় একটা আগ্রহ দেখলাম- রেলভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে।’
‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বলছেন, হোয়াই নট- চিটাগং থেকে এখানে এসে অফিস করব কেন হবে না? আমরা দ্রুতগতির ট্রেন বানাতে যা যা করা লাগে, সেইভাবে করতে পারলে ঢাকার ওপর চাপটা আপনা-আপনি কমে যাবে বলে জানান বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হক।
তিনি বিলেন, মেট্রোরেলের যে ছয়টি রুটের রূপরেখা রয়েছে, তা প্রধান সড়ক ধরে বিস্তৃত। তবে মেট্রোর বাইরে থাকা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিপূরক ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি সমীক্ষা করে প্রস্তাবনা দেওয়ার কথা হয়েছে, যাতে চলতি বছরেই কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া যায়। এছাড়া ঢাকার ওপর চাপ কমাতে রেলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে নগর বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
দ্রুতগতির ট্রেন চালু করা গেলে চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে যাতায়াত সহজ হবে এবং রাজধানীর ওপর চাপ কমবে-এমন ভাবনাও রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। তাই আলোচনার ভিত্তিতে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করে জমা দেওয়ার কথা হয়েছে। গণপরিবহনকে সমন্বিত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব রূপে গড়ে তুলতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সরকারের আগ্রহ রয়েছে বলে জানান তিনি।