রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসোলেশন সেন্টারের নীরবতা ভেঙে যাচ্ছে অসুস্থদের কষ্টকর শ্বাস-প্রশ্বাস ও কাশির শব্দে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হামের আকস্মিক প্রাদুর্ভাবে এখানে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে টিকাবিহীন শিশুদের ঝুঁকি।
আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছে ১৪ বছর বয়সী শাহাদী ইসলাম। টানা নয় দিন ধরে জ্বর, তীব্র কাশি ও বমিতে কাহিল হয়ে পড়েছে তার শরীর। চার দিন আগে শরীরে হামের ফুসকুড়ি দেখা দিলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে তার মা মেরিনা বেগম তাকে দ্রুত রামেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ১৩২ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। রোগীর এই চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে আইসোলেশন সেন্টার। সংক্রমণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এখানে রোগী ও স্বজনদের অবাধ যাতায়াত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জনবল সংকটের কারণে রোগীদের পাশে স্বজনদেরই থাকতে হচ্ছে।
মেরিনা বেগমও ছেলের পাশে রয়েছেন। তবে তিনি একা নন। তার সঙ্গে রয়েছে আরেক সন্তান, ছয় বছর বয়সী শুভ রাব্বী। শিশুটি ইতোমধ্যে একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত। জ্বরের কারণে তার ছোট শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
মেরিনা বেগম জানান, দুর্ভাগ্যজনকভাবে শুভ রাব্বীকে কখনো হামের টিকা দেওয়া হয়নি। এমনকি শাহাদী ইসলাম টিকা পেয়েছিল কিনা, সেটিও তার মনে নেই।
রাজশাহীর এই পরিস্থিতি এখন শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে হামের সংক্রমণ।
আইসোলেশন সেন্টারের একটি শয্যায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫০ বছর বয়সী রিকশাচালক মো. কাইমুদ্দীন। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাসিন্দা এই ব্যক্তির পাশে বসে তার স্ত্রী শামিমা বেগম উদ্বেগ নিয়ে দেখছেন স্বামীর গলায় ছড়িয়ে পড়া ফুসকুড়ি। তিনি বলেন, “জ্বরের কারণে তার মানসিক অবস্থাও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। শক্তিশালী ওষুধেও কাজ হচ্ছে না।”
হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত কাইমুদ্দীনকে প্রথমে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হলেও পরে আইসোলেশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়।
একই চিত্র দেখা গেছে ৩৫ বছর বয়সী কৃষক বদরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা এই কৃষকের অসুস্থতা শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী জ্বর ও মুখে ঘা দিয়ে। স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে শেষ পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তার শয্যার পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে চার বছর বয়সী মেয়ে। শিশুটির মা খালেদা খাতুন জানান, মেয়েটিকেও হামের টিকা দেওয়া হয়নি। একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, আইসোলেশন সেন্টারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে শিশুকে আনার ঝুঁকি সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন না।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, “শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও হামে আক্রান্ত হচ্ছেন। গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। কারও কারও আজও ভর্তি নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর সঠিক সংখ্যা যাচাই করে পরে জানানো হবে।”
রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়সের বাধা ভেঙে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়, বরং অঞ্চলের টিকাদান ব্যবস্থার ঘাটতির একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
দেশে চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে ইতোমধ্যে ৬৫০টির বেশি হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই মার্চ মাসে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন হায়দারের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগের মধ্যে টিকাবিহীন শিশুদের উপস্থিতি, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সচেতনতার ঘাটতিকে স্পষ্ট করে তুলছে।
চিকিৎসকরা আপাতত রোগীদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দিচ্ছেন। তবে টিকাদান ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে রাজশাহীর পরিবারগুলো যেন এক অদৃশ্য ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। যে ট্র্যাজেডি অনেক আগেই অতীত হওয়ার কথা ছিল, তা আবারও ফিরে এসেছে নতুন করে।