ফিরে আসো রবের আহ্বানে

মানুষ ভুল করে, পথভ্রষ্ট হয়, আবার ফিরে আসে, এই চিরন্তন বাস্তবতাকেই পবিত্র কোরআন এক অপূর্ব ভাষায় তুলে ধরেছে। এখানে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা শুধু শাস্তিদাতা নন; বরং তিনি দয়াময় প্রভু, যিনি নিজেই বান্দাদের তওবা ও প্রার্থনার ভাষা শিখিয়ে দেন এবং তাদের নিজের দিকে ফিরে আসতে আহ্বান জানান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি বললাম, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং সেখান থেকে যেখানে ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ্যে আহার করো। কিন্তু এই গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না, তাহলে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে যাবে।’ এরপর শয়তান তাদের সেখান থেকে বিচ্যুত করল এবং যে অবস্থায় তারা ছিল, সেখান থেকে তাদের বের করে দিল। তখন আমরা বললাম, ‘তোমরা একে অপরের শত্রু হয়ে পৃথিবীতে নেমে যাও। সেখানে তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আবাস ও জীবনোপকরণ থাকবে।’ অতঃপর আদম তাঁর প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু বাণী লাভ করলেন, এবং তিনি তাঁর তওবা কবুল করলেন। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা: বাকারাহ, আয়াত: ৩৫-৩৭)
সেই বাণীগুলো কী ছিল, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের পিতা আদম (আ.)-কে তওবার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন? কী ছিল সেই বরকতময় শব্দগুলো, যেগুলোর দ্বারা তাঁর তওবা কবুল করা হয়েছিল? তাদের অন্তর্নিহিত অর্থ, প্রভাব ও ব্যাপ্তিই বা কত গভীর? আল্লাহ তাআলা নিজেই সেই বাণীগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন এবং তাদের মর্যাদা ও প্রভাব ব্যাখ্যা করেছেন। ‘তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’(সুরা: আরাফ, আয়াত: ২৩)
আল্লাহ তাঁর অবাধ্যতার পরিণতি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন এবং আমাদেরকে সতর্ক করেছেন যে, শয়তান আমাদের চিরশত্রু, সে সর্বদা আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত এবং আমাদের পথভ্রষ্ট করার জন্য সদা তত্পর। আল্লাহ বলেন, ‘আমি বললাম, ‘তোমরা সবাই সেখান থেকে নেমে যাও। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট হেদায়েত আসবে, তখন যারা আমার সেই হেদায়েত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা: বাকারাহ, আয়াত: ৩৮)
এই বাণীগুলো আমাদের জীবনপথে চলার প্রতিটি মুহূর্তে গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা যেন শয়তানের ধোঁকা, তার কুমন্ত্রণা, তার সূক্ষ্ম চক্রান্ত এবং তার চিরস্থায়ী শত্রুতা থেকে সর্বদা সতর্ক থাকি। একই সঙ্গে এগুলো আমাদেরকে এই শিক্ষাও দেয় যে, যদি আমরা কখনো পাপ বা সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হয়ে পড়ি, তবে হতাশ না হয়ে অবিলম্বে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা উচিত।
দ্বিতীয় উদাহরণ: আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে তওবা, প্রার্থনা ও তাঁর দিকে ফিরে আসার জন্য  তিনি তাঁর বান্দাদের কিছু দোয়া শিক্ষা দেন, সেগুলো পাঠ করতে উত্সাহিত করেন এবং অতঃপর সেগুলো কবুল করে নেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর সেই মত্স্যবন্দী (ইউনুস আ.)-এর কথা স্মরণ করো, যখন সে ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল যে, আমি তাকে সংকুচিত করব না। অতঃপর সে অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান জানাল, ‘আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; আপনি পবিত্র ও মহিমান্বিত। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা: আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭) এখানে ইউনুস (আ.) তাঁর সেই দোয়ায় আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন, তাঁকে সব ধরনের অপূর্ণতা, দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের ভুল ও সীমালঙ্ঘনের কথাও বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করেছেন। তখন আল্লাহ ইউনুস (আ.)-এর দোয়া কবুল করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘অতঃপর আমরা তার ডাকে সাড়া দিলাম, তাকে দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি দিলাম। আর এভাবেই আমরা মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।’ (সুরা: আম্বিয়া, আয়াত: ৮৮)

এছাড়াও আল্লাহ তাআলা যাকারিয়া (আ.)-কে এমন দোয়া শিক্ষা দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে তাঁর প্রার্থনা কবুল হয় এবং তাঁকে এক সত্ ও নেক সন্তান দান করা হয়। আল্লাহ বলেন: ‘আর যাকারিয়া (আ.)-এর কথাও স্মরণ করো, যখন তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে আরজি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘হে আমার রব! আমাকে একা (উত্তরাধিকারীহীন) রেখে দিও না; আর তুমিই তো সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।’ অতঃপর আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম, তাঁকে ইয়াহইয়া দান করলাম এবং তাঁর স্ত্রীর অবস্থাও সংশোধন করে দিলাম। নিশ্চয়ই তারা সত্কর্মে প্রতিযোগিতা করত, আশা ও ভয়ের সঙ্গে আমাদেরকে ডাকত এবং আমাদের প্রতি ছিল পরম বিনয়ী। (সুরা: আম্বিয়া, আয়াত: ৮৯-৯০)
এ ঘটনাগুলো আমাদের জন্য বিশেষ করে যারা বিপদগ্রস্ত, যারা দুঃখ-কষ্টে নিমজ্জিত, কিংবা যারা সন্তান-সন্ততি থেকে বঞ্চিত, তাদের জন্য এতে রয়েছে অনুপ্রেরণার বার্তা। তাদের উচিত নিরাশ না হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তাঁর নিকট প্রার্থনা করা। কেননা তিনি সর্বশক্তিমান, সবকিছুর নিয়ন্তা; তিনি যখন কোনো কিছুকে বলেন, ‘হও’ তখন তা অনায়াসেই হয়ে যায়।
তৃতীয় উদাহরণ: যে তিনজন সাহাবি যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে ছিলেন, তাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও শিক্ষণীয়। তাদের জন্য পৃথিবী, তার বিস্তৃততা সত্ত্বেও, সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল; তাদের অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল; জীবন যেন অসহনীয় হয়ে পড়েছিল। তাদের সঙ্গীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল, নিকট ও দূরের মানুষজন তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এমনকি তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলম, আল্লাহ ছাড়া তাদের জন্য আর কোনো আশ্রয় বা নিরাপত্তা নেই। তখন আল্লাহ তাদের ব্যাপারে এমন আয়াত অবতীর্ণ করেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত পাঠ করা হবে। আল্লাহ বলেন: ‘আর তিনি (ক্ষমা করলেন) সেই তিনজনকেও, যারা পিছিয়ে ছিল, এমনকি পৃথিবী তার প্রশস্ততা সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল, এবং তাদের অন্তরও তাদের জন্য ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। তারা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহ ছাড়া তাঁর কাছ থেকে রক্ষা পাওয়ার আর কোনো আশ্রয় নেই। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা তওবা করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা: তাওবাহ, আয়াত: ১১৮)
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি পরম দয়ালু, অসীম করুণাময় এবং তাদের প্রতিটি অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। আর তিনি কখনো কোনো জাতিকে শাস্তি দেন না বা ধ্বংস করেন না, যতক্ষণ না তিনি তাদের সামনে সত্যকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন। তিনি বিষয়গুলো ব্যাখ্যা না করে কাউকে জবাবদিহির মুখোমুখি করেন না এবং সতর্ক না করে কাউকে শাস্তিও প্রদান করেন না। আল্লাহ বলেন: ‘আর কোনো জাতিকে পথ প্রদর্শনের পর, তাদেরকে কী থেকে বিরত থাকতে হবে তা স্পষ্ট করে না দেওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ।’ (সুরা: তাওবাহ, আয়াত: ১১৫)
অতএব, আমাদের জীবনের প্রতিটি ভুল, দুঃখ ও বিপর্যয়, আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক একটি সুযোগ। তিনি সর্বদা আমাদের জন্য তওবার দরজা খুলে রেখেছেন এবং আন্তরিক ডাকে সাড়া দেন। তাই নিরাশ না হয়ে, বিনয় ও আশা নিয়ে তাঁর দিকে ফিরে আসাই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা।