‘হঠাৎ করেই আমার মেয়ে ছটফট শুরু করল। নার্স এসে তড়িঘড়ি করে অক্সিজেন দিল। একটা ইনজেকশন দিল। বড় একটা স্যালাইনও লাগাল। তারপরই নাক-মুখ দিয়ে রক্ত এল। মেয়ে আমার দুনিয়া থেকে চলে গেল। আমরা আর কিছুই করতে পারলাম না।’ এ কথা বলেই মোবাইল ফোনেই কাঁদতে লাগলেন চামেলী খাতুন। আর কথা বলতে পারলেন না।
চামেলী খাতুনের দুই মাসের মেয়ে নেহা আক্রান্ত হয়েছিল সংক্রামক রোগ হামে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবস্থায় বৃহস্পতিবার সকালে মারা যায়। প্রয়োজন থাকলেও নেহা শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) সিরিয়াল পায়নি। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সে মারা গেছে। তারপর থেকে কান্না থামছে না নেহার মা চামেলী খাতুনের। তার বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলার বখতারপুর গ্রামে।
মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রামেক হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি বাড়তে থাকে। শনিবার পর্যন্ত এই হাসপাতালে ৪৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত নতুন করে ২৭ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ৯ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ১৫৪ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ভর্তি হয়েছে ৫৩৫ জন।
বৃহস্পতিবার রামেক হাসপাতালে মারা গেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার টেকালা গ্রামের কৃষক সুইট রানার ৬ মাস বয়সী ছেলে শামিউল ইসলাম। শুক্রবার দুপুরে সুইট রানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানান, জুমার নামাজের পর ছেলের কবর জিয়ারত করে তিনি বাড়ি ফিরছেন। ছেলের মৃত্যুর পর থেকে কাঁদতে কাঁদতে তার স্ত্রী পলি খাতুনও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বাড়িতে তার স্যালাইন চলছে। তিনি জানান, হামে আক্রান্ত শামিউলকে নিয়ে নিয়ে তারা ১৩ দিন হাসপাতালে ছিলেন। এরমধ্যে শেষ ৯ দিন শামিউল ছিল পিআইসিইউতে। এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসায় প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
গত মঙ্গলবার হাসপাতালে মারা গেছে পাবনার আতাইকুলা উপজেলার চরপাড়া গ্রামের মাদ্রাসাশিক্ষক মো. আতাউল্লাহর ১০ মাসের ছেলে জুবায়ের। শুক্রবার দুপুরে মো. আতাউল্লাহ জানান, হামে ছেলের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী হাজেরা খাতুন কথা বলছেন না। চুপচাপ আছেন। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তারা নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও পারছেন না।
মো. আতাউল্লাহ বলেন, ‘আমার প্রথম সন্তান মারা গেছে। দ্বিতীয় সন্তানটা আছে। তার বয়স ৪ বছর। তৃতীয় সন্তানটাও ১০ মাস বয়সেই চলে গেল। যার বুকের ধন যায়, সে-ই আসল কষ্টটা বোঝে। সে তো হামের টিকা পায়নি। টিকা পেলে এ রকম না-ও হতে পারত।’
হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডকে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে। এখানে শুধু হামে আক্রান্ত শিশুদেরই চিকিৎসা চলছে। এই ওয়ার্ডে মায়েরা তাদের বুকের ধনকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন।
শুক্রবার সকালে ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ৫ মাসের শিশু আসমাকে কোলে নিয়ে বসে আছেন তার দাদি আনজু বেগম। তাদের বাড়ি কুষ্টিয়া সদরের হরিপুর গ্রামে। মুখের ভেতরেও আসমার হাম হয়েছে। তাই ওষুধ দেওয়া হয়েছে। হাতে ক্যানুলা দিয়ে স্যালাইন যাচ্ছে। নাকের কাছে ন্যাসাল ক্যানুলা। অক্সিজেন চলছে। আনজু বেগম জানান, ৪ দিন আগে তারা শিশুর শরীরে হাম দেখেছেন। তাই গত বুধবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।
আসমার মা চুমকি খাতুন দেখালেন, ‘হাসপাতালে আনার পর এইটুকু সময়ের মধ্যে হাতে-পায়ের ১০-১২ জায়গা ফুটা করা হয়েছে ক্যানুলা করতে। ভ্যান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। আমার এইটুকু বাচ্চা যে কী করে সহ্য করছে আমি জানি না। আমরা এই কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।’
দুই বছরের মোহাম্মদ আলীকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন মা সুমেরা খাতুন। মোহাম্মদ আলীর মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। তার দাদি নাজমা বেগম জানালেন, তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বারোঘরিয়া গ্রামে। তাদের এলাকার অনেক বাচ্চারই হাম হয়েছে। অনেকে বাচ্চাদের পানিপড়া খাওয়াচ্ছেন। কবিরাজের তাবিজ-কবজ বাঁধছেন। কিন্তু তারা হাসপাতালে এসেছেন। ১৩ দিন থেকে তারা বাচ্চার জীবন বাঁচাতে লড়াই করছেন।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে আমরা সার্বক্ষণিক চিকিৎসক নিশ্চিত করেছি। তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে যা যা করা দরকার তার সবই করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। তারা সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। পাশাপাশি কোন এলাকা থেকে রোগী বেশি আসছে, কোন ধরনের রোগী বেশি আসছে- এসব নিয়ে তারা কাজ করছেন।’
রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) দপ্তর জানিয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভাগের হাসপাতালগুলো থেকে রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে পরীক্ষা করছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৮৬৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৪৭৯ জনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এতে ১৬১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার ৩৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৫৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিভাগের ২৭টি এলাকায় একাধিক রোগী পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় হামের সংক্রমণ হয়েছে।
বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘হাম নিয়ন্ত্রণ করতে শিশুদের টিকা প্রয়োগ শুরু হয়েছে। বিভাগের ৮ জেলার ১০টি উপজেলায় টিকাদান কার্যক্রম চলছে। ৬ মাস বয়স হলেই শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।’ ৬ মাসের আগেই শিশুরা আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে ৬ মাসের নিচে হামের টিকা দেওয়ার নজির আছে বলে আমার জানা নেই। এটা নিয়ে গবেষণা দরকার।’