পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের ‘মৃত্যুর’ খবর ভেসে বেড়াচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে। পাকিস্তানের সরকার অবশ্য এই খবরকে ‘গুজব’ হিসেবে উল্লেখ করে বলছে, কারাগারে থাকা ইমরান খান বেঁচে আছেন এবং সুস্থ আছেন। তবে গত বেশ কিছুদিন ধরে ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি তার পরিবারকে। এ অবস্থায় তার ‘মৃত্যুর’ খবরে সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ইমরান খান যে সত্যিই জীবিত আছেন, জেল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণ চেয়েছে তার পরিবার।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে ইমরান খানের ছেলে কাশিম খান সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, তার বাবাকে কয়েক সপ্তাহ ধরে সম্পূর্ণ ‘একা’ রাখা হয়েছে এবং আত্মীয়স্বজন বা আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া ইমরান খান চার বছর পর পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি কারাগারে বন্দি। কয়েকটি মামলায় সাজাও হয়েছে তার। অবশ্য তার দল পিটিআইর দাবি, ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তার বাবা ৮৪৫ দিন ধরে কারাগারে আটক আছেন জানিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে এক্সে দেওয়া পোস্টে ইমরান খানের ছেলে কাশিম লিখেছেন, ‘গত ছয় সপ্তাহ ধরে তাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একটি ডেথ সেলে একা রাখা হয়েছে। স্পষ্ট আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তাকে তার বোনদের সঙ্গে সব ধরনের সাক্ষাৎ থেকে বিরত রাখা হয়েছে। কোনো ফোনকল নেই, কোনো সাক্ষাৎ নেই, আর তার শারীরিক অবস্থার কোনো খবরও নেই। আমার ভাই ও আমি কোনোভাবেই বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।’
কাশিম আরও অভিযোগ করেন, তার বাবার ওপর যে শর্তগুলো আরোপ করা হয়েছে, তা কোনো আইনি প্রক্রিয়ার অংশ নয়, বরং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি গোপন করার জন্য এটি একটি ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা। তিনি লিখেছেন, ‘সবকিছু এভাবে অন্ধকারে রাখা কোনো নিরাপত্তা প্রটোকলের অংশ নয়। এটা স্পষ্ট থাকা দরকার যে আমার বাবার নিরাপত্তা এবং এই অমানবিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিটি পরিণতির জন্য পাকিস্তান সরকার এবং তার মাস্টাররা সম্পূর্ণ আইনি, নৈতিক ও আন্তর্জাতিক দায় বহন করবে।’ কাশিম বিদেশি সরকার এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তার বাবা যে জীবিত আছেন তার প্রমাণ, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরিবারের সদস্যদের প্রবেশাধিকার, ‘অমানবিক বিচ্ছিন্নতা’ বন্ধ করা এবং ‘শুধু রাজনৈতিক কারণে বন্দি পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতার’ মুক্তি দাবি করেন।
এদিকে, ইমরান খানের বোন আলিমা খানম জানিয়েছেন, ইসলামাবাদ সংলগ্ন উচ্চ-নিরাপত্তা সম্পন্ন আদিয়ালা জেলে তার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য পরিবারকে মাসের পর মাস ধরে চেষ্টা করতে হচ্ছে। তিনি ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে বলেন, ‘গত ছয়-সাত মাস ধরে তারা অনেক ঝামেলা করছে; কখনো আমাকে দেখা করতে দেয়, কখনো আমার কোনো বোনকে দেখা করতে দেয়, কখনো আবার কাউকেই দেখা করতে দেয় না। অনেক সময় আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করি।’
আরেক বোন নুরীন নিয়াজি ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানান, চার সপ্তাহ ধরে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুই জানি না। তারা আমাদের কিছু বলছে না বা কাউকেই দেখা করতে দিচ্ছে না। এমনকি সাক্ষাতের সময় পূর্বনির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও পিটিআই নেতাদেরও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ নিয়াজি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত বছর প্রায় তিন সপ্তাহের জন্য ইমরান খানকে বিদ্যুৎ বা পড়ার সামগ্রী ছাড়া সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছিল।
গুজবের কারণ বিচ্ছিন্নতা, বলছে পিটিআই: ইমরান খানের জ্যেষ্ঠ সহযোগী জুলফি বুখারি জানান, যদিও তার দল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর গুজবকে বিশ্বাস করে না, তবুও এটি অনলাইনে জোরদার হয়েছে। কারণ, ‘ইমরান খানকে প্রায় এক মাস ধরে কারও সঙ্গে দেখা করতে না দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের শুধু তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া উচিত। এতেই সব সামাজিক মাধ্যমের জল্পনা এবং তার স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যের অবনতি, তার জীবনযাত্রার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ শেষ হবে।’ তিনি আরও বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যখন পার্লামেন্টে সেনাবাহিনীর প্রধানের অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে সংশোধনী পাস করা হচ্ছে এবং তার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে, তখন ইমরান খানকে ‘বন্দি’ রাখা হয়েছে, যাতে তিনি এর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে না পারেন।
যা বলছে আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষ: আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষ সব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে, ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান কারাগারেই আছেন এবং তার শারীরিক অবস্থাও ভালো। জেল প্রশাসনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইমরান খানের স্বাস্থ্য সম্পর্কে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতৃত্বকে জানানো হয়েছে। পিটিআই প্রধানকে সব প্রয়োজনীয় যত্ন দেওয়া হচ্ছে।’ তারা তাকে গোপনে অন্য কোথাও স্থানান্তরের খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, ‘ইমরান খান আদিয়ালা জেলে আছেন এবং সুস্থ আছেন। তার স্থানান্তর নিয়ে সামাজিক মাধ্যমের গুজব ভিত্তিহীন।’
এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ খানও ইমরান খানের ‘মৃত্যুর’ খবরকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘এটা একেবারে ভুল। তার স্বাস্থ্য ভালো আছে এবং তার যত্ন নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকদের একটি দল তাকে সাপ্তাহিক ও দৈনিক ভিত্তিতে পরীক্ষা করে এবং তার ওষুধ, খাবার, সুযোগ-সুবিধা ও ব্যায়ামের দেখভাল করে।’