১/১১-তে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটলে তদন্ত করবে ট্রাইব্যুনাল

এক–এগারোর সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়ে থাকলে স্বপ্রণোদিতভাবে তা ট্রাইব্যুনাল (তদন্ত সংস্থা) তদন্ত করবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, তদন্তের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন করা হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন চিফ প্রসিকিউটর। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আমরা এক কথায় কি বলতে পারব যে ক্রসফায়ারের সব ঘটনা ট্রাইব্যুনাল তদন্ত করবে। যেটা এখানে বিচার হওয়ার মতো সেখানে হবে, বাকিটা অন্য…।’

এর জবাবে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে…বৈষম্যবিরোধী–সংক্রান্ত যে মামলাগুলো হয়েছে, ইভেন দেন (এমনকি) এক–এগারোর সময় যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা ঘটেছে; সেগুলো যদি আমাদের এই ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত হয়, সেগুলো আমরা তুলে নিয়ে আসব।’

এ সময় আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, এক–এগারোর একজন কুশীলব বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আফজাল নাছের, তাঁকে কি ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলায় আনা হবে?

এর জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এক–এগারোর সময় বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যাঁদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, ট্রাইব্যুনাল সুয়োমোটো (স্বপ্রণোদিত) সেগুলো ইনভেস্টিগেশন (তদন্ত) করবে। যদি সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়, ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন করা হবে।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা হস্তক্ষেপে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। তখন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টারও দায়িত্বে ছিলেন। তাঁকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর সেনা–সমর্থিত নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যা এক–এগারো (১/১১) নামে পরিচিত।

এক-এগারোর পটপরিবর্তনের প্রধান উদ্যোক্তা বা মূল কুশীলব হিসেবে মনে করা হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে। তাঁকে ২৩ মার্চ গভীর রাতে গ্রেপ্তার করে ডিবি। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গত ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দুজনকেই ট্রাইব্যুনালে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

ক্রসফায়ারের মামলার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে
সারা দেশে যত ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে, সব মামলার কপি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সংগ্রহ করছে বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ক্রসফায়ারের যে মামলাগুলো হয়েছে, সেগুলো তাঁরা যাচাই-বাছাই করবেন। এ জন্য একটা কমিটি গঠন করা হবে।

যাচাই-বাছাইয়ের পর ক্রসফায়ারের অপরাধগুলোর মধ্যে যেগুলো ট্রাইবুনালের বিচারের আওতাভুক্ত হবে, সেসব বিচার ট্রাইবুনালে করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর।

শাপলা চত্বরের মামলায় জলিল মণ্ডল কারাগারে

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল জলিল মণ্ডলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল দুপুরে তাঁকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ হাজির করা হয়। পরে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

এই মামলায় গত বছরের ১৪ মে জলিল মণ্ডলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। আর গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এ মামলার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের বলেন, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। তাঁর (জলিল মণ্ডল) সার্বিক পরিকল্পনাতেই (শাপলা চত্বরে) সব ঘটনা ঘটেছে-এ রকম তদন্তে আসছে। এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন খুব তাড়াতাড়ি যেন জমা হয়, সে বিষয়ে তাঁরা তৎপর আছেন।

শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে কত মানুষ মারা গেছে-এ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘মৃত ব্যক্তিদের তালিকাও আমরা অলমোস্ট পেয়েছি। এবং… আমরা অনুসন্ধান করছি, আরও আছে কি না। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আপনারা ইনশা আল্লাহ পেয়ে যাবেন, আগামী তারিখের (৫ এপ্রিল এ মামলার পরবর্তী দিন ধার্য আছে) মধ্যে।’
সেই তালিকায় কতজনের তথ্য (হত্যার শিকার) আছে, এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘১৫-২০ জন হতে পারে।’

‘৫ আগস্টের পর করা মামলা যাচাই-বাছাই করা হবে”
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারা দেশে যত মামলা হয়েছে, তা যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এক-একটা মামলায় হয়তো ৪০০ থেকে ৫০০ আসামি। সব আসামি দোষী-এটা তাঁরা মনে করেন না। এর মধ্যে দোষী ব্যক্তি যেমন আছে, অনেক নিরপরাধ মানুষও আছে।… অনেক সময় যারা প্রকৃত দোষী তাদের ছেড়ে দিচ্ছে। আবার অনেক নিরপরাধ মানুষ জেল খাটছে।’

এ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ৫ আগস্টের (২০২৪ সাল) পর সারা দেশে যত মামলা হয়েছে, সব কটির তথ্য তিনি তদন্ত সংস্থার কাছে চেয়েছেন। তাঁর কাছে ইতিমধ্যে ৫০০-৭০০ মামলার কপি জমা হয়েছে। তিনি আশা করছেন, এক-দুই দিনের মধ্যে সারা দেশের সব মামলার কপি তাঁর কাছে আসবে। সব মামলা তাঁরা যাচাই-বাছাই করে দেখবেন।
আমিনুল ইসলাম বলেন, তাঁরা নজরে রাখবেন থানায় যে মামলাগুলো হয়েছে, সেসব মামলায় কোনো দোষী ব্যক্তি যেন ছাড়া না পায়। কোনো নির্দোষ মানুষ যেন অহেতুক জেলে না যায়। এটাকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ মহল যাতে মামলা বাণিজ্যের নামে ব্যবসা করতে না পারে। যদি কেউ হয়রানি করার জন্য মিথ্যা মামলা করে, তাহলে প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাঁরা সুপারিশ করবেন।

হাসানাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদল ও জাসাসের দুজন নেতাকে ২০১৫ সালে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। হাসানাত আবদুল্লাহ হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ গতকাল এই অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ভুক্তভোগী দুজন হলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাসাসেন সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।