আমার রব আমাকে পথ দেখাবেন

গোলামী বা ইবাদাতের একমাত্র হকদার হলো আমার পরম দয়ালু মহামহিম আল্লাহ তা’আলা, কারণ তিনিই আমাকে এই সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। এই সৃষ্টি কূশলতার মধ্যে অন্য কারো কোন অংশ বা অবদান নাই। তাই আমি আমার ইবাদাতকে তাঁর জন্য সুনির্দিষ্ট করাকে সঠিক ও যথার্থ মনে করি। অন্য কোন সত্তা কেমন করে আমার ইবাদাতের হকদার হতে পারে, যেহেতু আমাকে সৃষ্টি করার ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্র কোন অংশ নেই। এই যুক্তি ছিল হযরত ইবরাহিম আ: এর। তাঁর যুক্তিগুলো আল্লাহ তা’আলা আল কুরআনের সুরা শুয়ারায় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছিলেন : যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনিই আমাকে পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাকে খাওয়ান ও পান করান এবং বোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন। (শুয়ারা: ৭৮-৮০)

তিনি আমাকে সৃষ্টি করে অন্ধকারে ছেড়ে দেননি বরং তিনি আমাকে আলোকিত রাজপথও দেখিয়ে দিয়েছেন। এমনটি করার বা মনে করার সুযোগ তিনি রাখেননি যে, তিনি কেবল সৃষ্টি করেই ছেড়ে দিয়েছেন এখন সামনে পথ চলার জন্য বা দুনিয়ায় জীবন যাপনের জন্য অন্য কারোর পথ বা চিন্তা-চেতনার অনুসরণ করবে। মহান রব সৃষ্টি করার সাথে সাথে পথনির্দেশনা. প্রতিপালন, দেখাশুনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজন পূর্ণ করার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন। যখন মানুষ দুনিয়ায় পদার্পন করে তখনই তার মায়ের বুকে দুধের ঝর্ণাধারা সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে তাকে স্তন চোষার ও গলা দিয়ে দুধ নিচের দিকে নামিয়ে নেবার কায়দা শিখিয়ে দেয়া হয়। তারপর প্রতিপালন, প্রশিক্ষণ ও পথ প্রদর্শনের কাজ প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে মৃত্যুর শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত বরাবর চালু থাকে। জীবনের প্রতিটি স্তরে তাদের অস্তিত্ব, বিকাশ, উন্নয়ন ও স্থায়ীত্বের জন্য যেসব সাজ-সরাঞ্জাম প্রয়োজন তা সবই মহান আল্লাহ তা’আলা পৃথিবী থেকে আকাশ পর্যন্ত সঠিকভাবে যোগান দিয়ে রেখেছেন। এই সাজ-সরাঞ্জাম থেকে লাভবান হবার এবং একে সঠিকভাবে কাজে লাগাবার জন্য যে ধরণের শক্তি ও যোগ্যতার প্রয়োজন তা সবই আপন সত্তায় সমাহিত রাখা হয়েছে। জীবনের প্রতিটি বিভাগে তার যে ধরনের পথনির্দেশনার প্রয়োজন তা দেবার পূর্ণ ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন।

এই সংগে তিনি মানবিক অস্তিত্বের সংরক্ষণের এবং তাকে বিপদ-আপদ.রোগ-শোক, ধ্বাংসকর জীবানু ও বিষাক্ত প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য তার নিজের শরীরের মধ্যে এমন শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন মানুষের জ্ঞান এখনো যার পুরোপুরি সন্ধান লাভ করতে পারেনি। আল্লাহর এ শক্তিশালী প্রাকৃতিক ব্যবস্থা যদি না থাকতো, তাহলে সামান্য একটি কাঁটা শরীরের কোন অংশে ফুটে যাওয়াও মানুষের জন্য ধ্বংসকর প্রমাণিত হতো এবং নিজের চিকিৎসার জন্য কোন প্রচেষ্টাই সফল হতো না। আল্লাহ তা’আলার এই সর্বব্যাপী অনুগ্রহ ও প্রতিপালন কর্মকা- যখন প্রতি মহুর্তে সকল দিক থেকে মানুষকে সাহায্য করছে তখন মানুষ তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন সত্তার সামনে মাথা নত করবে এবং প্রয়োজন পূরণ ও সংকট উত্তরণের জন্য অন্য কারো আশ্রয় গ্রহণ করবে, এর চেয়ে বড় মূর্খতা ও বোকামী এবং এর চেয়ে বড় অকৃতজ্ঞতা আর কি হতে পারে।
তিনি দয়া করে গোলক ধাঁধার অসংখ পথ ও মতের মধ্যে থেকে সঠিক পথ ও মতটি বেঁচে নেয়ার জন্য একজন রাসুল পাঠিয়েছেন। তিনি আমাদের হাত ধরে সত্যের রাজপথে তুলে দিয়ে গিছেন। এটি পরম করুণাময় আল্লাহ তা’আলার এক বিশেষ নিয়ামত। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত যে ঠিক নয়, ইবরাহিম আ: এর একটি কারণ ছিল যা আল্লাহ তা’আলা আল কুরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘তিনি আমাকে মুত্যু দান করবেন এবং পুনর্বার আমাকে জীবন দান করবেন। তাঁর কাছে আমি আশা করি, প্রতিদান দিবসে তিনি আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা শুয়ারা : ৮১-৮২)। অর্থাৎ আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক কেবলমাত্র এ দুনিয়া এবং এখানে সে যে জীবন যাপন করে তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অস্তিত্বের সীমানায় পা রাখার পর থেকে শুরু করে মৃত্যুর পুর্ব মুহুর্তে শেষ নি:শ^াস ত্যাগ করার সাথে সাথেই তা খতম হয়ে যায় না। বরং এরপর তার পরিণামও পুরোপুরি ও পুরোপুরি আল্লাহরই হাতে আছে। আল্লাহই তাকে অস্তিত্ব দান করেছেন।

সবশেষে তিনি তাকে দুনিয়া থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। দুনিয়ায় এমন কোন শক্তি নেই যা মানুষের এ ফিরে যাওয়ার পথ রোধ করতে পারে। যে হাতটি মানুষকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যায় আজ পর্যন্ত কোন ঔষধ, চিকিৎসক,দেব-দেবীর হস্তক্ষেপ তাকে পাকড়াও করতে পারেনি। এমনকি মানুষের যে একদল মানুষকে উপাস্য বানিয়ে পূজা-আরাধনা করেছে তারা নিজেরাও নিজেদের মৃত্যুকে এড়াতে পারেনি। একমাত্র আল্লাহই ফায়সালা করেন, কোন ব্যক্তিকে কখন এ দুনিয়া থেকে ফিরিয়ে নেবেন এবং যখন যার তাঁর কাছে চলে যাবার সমন এসে যায় তখন ইচ্ছায় অনিচ্ছায় তাকে চলে যেতেই হয়।