কোরআনের বরকত ও তাকওয়ার অপরিহার্যতা

কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫৪-১৫৫

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে 

ثُمَّ اٰتَیۡنَا مُوۡسَی الۡكِتٰبَ تَمَامًا عَلَی الَّذِیۡۤ اَحۡسَنَ وَ تَفۡصِیۡلًا لِّكُلِّ شَیۡءٍ وَّ هُدًی وَّ رَحۡمَۃً لَّعَلَّهُمۡ بِلِقَآءِ رَبِّهِمۡ یُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۱۵۴﴾

وَ هٰذَا كِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰهُ مُبٰرَكٌ فَاتَّبِعُوۡهُ وَ اتَّقُوۡا لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ ﴿۱۵۵﴾ۙ

সরল অনুবাদ

(১৫৪) আর মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম যা সৎকর্মপরায়ণের জন্য পূর্ণাঙ্গ; যা সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, পথনির্দেশ এবং দয়াস্বরূপ; যাতে তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিশ্বাস করে।

(১৫৫) এ কিতাব আমি অবতরণ করেছি যা কল্যাণময়। সুতরাং ওর অনুসরণ কর এবং সাবধান হও, হয়তো তোমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হবে।

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা আনআমের ১৫৪ নম্বর আয়াত কোরআন কারীমের একটি বর্ণনাভঙ্গি বর্ণিত হয়েছে।

যা পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অর্থাৎ, যেখানে কোরআনের কথা আছে, সেখানে তাওরাতের এবং যেখানে তাওরাতের কথা আছে, সেখানে কোরআনের কথাও আছে। এর বেশ কয়েকটি দৃষ্টান্ত হাফেয ইবনে কাসীর উল্লেখ করেছেন। এই নিয়মানুযায়ী এখানে তাওরাত এবং তার বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করে বলা হচ্ছে যে, সেটাও (তাওরাতও) তার যুগের এক সর্বাঙ্গীন কিতাব ছিল।

তাতে তাদের দ্বীনের প্রয়োজনীয় সমস্ত বিষয়ের বিশদ বর্ণনা ছিল এবং তা হিদায়াত ও রহমতের উৎসও ছিল।

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা (আ.)-এর প্রতি অবতীর্ণ তাওরাত-এর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। এখানে প্রথমেই বলা হয়েছে; “সৎকর্মপরায়ণের জন্য পূর্ণাঙ্গ”। অর্থাৎ, তাওরাত ছিল এমন এক পরিপূর্ণ বিধানগ্রন্থ, যা সত্যিকার অর্থে নেককার, আল্লাহভীরু ও সৎলোকদের জন্য হিদায়াতের পূর্ণ মানদণ্ড সরবরাহ করত।

যারা আন্তরিকভাবে আল্লাহর আনুগত্য করতে চেয়েছে, তাদের জন্য এতে কোনো অপূর্ণতা ছিল না।

এরপর বলা হয়েছে; “সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ”। এর দ্বারা উদ্দেশ্য এই নয় যে তাওরাতে দুনিয়ার সব বিজ্ঞান, শিল্প বা জাগতিক জ্ঞান লিপিবদ্ধ ছিল; বরং উদ্দেশ্য হলো— দ্বীন, শরিয়াহ, হালাল-হারাম, নৈতিকতা, ইবাদত, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবজীবনের কল্যাণমূলক দিকগুলো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সব মৌলিক নির্দেশনা সেখানে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত ছিল।

আয়াতে আরও বলা হয়েছে;  এটি ছিল “পথনির্দেশ এবং দয়াস্বরূপ”। অর্থাৎ, তাওরাত কেবল আইন-কানুনের শুষ্ক গ্রন্থ ছিল না; বরং তা ছিল বিভ্রান্ত মানবসমাজের জন্য আলোর দিশারি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ রহমত।

যারা এর অনুসরণ করত, তারা সঠিক পথ খুঁজে পেত এবং আত্মিক ও সামাজিক শান্তি লাভ করত।

সবশেষে বলা হয়েছে যে, “যাতে তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিশ্বাস করে”। অর্থাৎ, তাওরাতের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে আখিরাতমুখী করা, আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে জবাবদিহির বিশ্বাস জাগ্রত করা। কারণ, আখিরাতের জবাবদিহির দৃঢ় বিশ্বাস ছাড়া মানুষ প্রকৃত অর্থে ন্যায়পরায়ণ ও সংযমী হতে পারে না।

সুরার ১৫৫ নং আয়াতে সরাসরি কোরআনুল কারিম-এর কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করছেন— “এ কিতাব আমি অবতরণ করেছি”— অর্থাৎ এটি মানুষের রচনা নয়, কোনো দার্শনিক চিন্তার ফল নয়; বরং সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহি।

কোরআনকে বলা হয়েছে— “কল্যাণময়” (মুবারাক)। এর অর্থ হলো; এই কিতাবের সঙ্গে কল্যাণ অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র; যে পর্যায়েই কোরআনের শিক্ষা বাস্তবায়িত হবে, সেখানেই বরকত, ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। এর বরকত শুধু দুনিয়াবি কল্যাণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আখিরাতের চিরস্থায়ী মুক্তির পথও এতে নিহিত।

এরপর আল্লাহ বলেন; “সুতরাং ওর অনুসরণ কর”। এখানে শুধু তিলাওয়াত বা মুখস্থ করাকে উদ্দেশ্য করা হয়নি; বরং আকীদা, আমল, চরিত্র, আইন ও জীবনব্যবস্থায় কোরআনের অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আর “সাবধান হও”  অর্থাৎ তাকওয়া অবলম্বন করো, আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর সীমা লঙ্ঘন থেকে নিজেকে রক্ষা করো। কোরআনের অনুসরণ ও তাকওয়া; এই দুটির সমন্বয়েই আল্লাহর রহমত লাভ সম্ভব।