নিম্নে দাম্পত্য জীবনে শান্তি লাভে করণীয় কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো—
পরস্পর ভালোবাসা : দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো পরস্পর ভালোবাসা। মহান আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘মহব্বত ও রহমত’ সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদের, যাতে তোমরা তাদের সঙ্গে শান্তিতে বাস করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’
(সুরা : রুম, আয়াত : ২১)
অনেকে তাদের স্ত্রীর প্রতি থাকা ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ করতে চায় না। তারা ভাবে, এতে তাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে; অথচ এটা ভুল ধারণা। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) তাঁর স্ত্রীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করতেন এবং তা গোপন করতেন না। তিনি স্নেহভরে স্ত্রীদের ডাকতেন, তাদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ করতেন এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে কোনো সংকোচ বোধ করতেন না।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আনাস (বিন মালিক) (রা.) থেকে বর্ণিত, বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! কোন ব্যক্তি আপনার নিকট অধিক প্রিয়? তিনি বলেন, আয়েশা। আবার বলা হলো, পুরুষদের মধ্যে? তিনি বলেন, তার পিতা। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১০১)
তাঁর আচরণ প্রমাণ করে যে কোমলতা মানুষের চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে এবং পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্বহস্তে কোনো দিন কাউকে আঘাত করেননি, কোনো নারীকেও না, খাদিমকেও না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ছাড়া। আর যে তাঁর অনিষ্ট করেছে তার থেকেও প্রতিশোধ নেননি। তবে আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এমন বিষয়ে তিনি তাঁর প্রতিশোধ নিয়েছেন। (মুসলিম, হাদিস : ৫৯৪৪)
বিনয় : বিনয় দাম্পত্য সম্পর্ককে দৃঢ় করে। নবী (সা.) ছিলেন সমগ্র বিশ্বের নেতা, তবু তিনি তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ করতেন। তিনি নিজ হাতে তাঁদের সাহায্য করতেন এবং কখনো এটিকে নিজের মর্যাদার পরিপন্থী মনে করেননি। বরং এর মাধ্যমে তিনি শিখিয়েছেন, স্ত্রীর সঙ্গে ভালো আচরণ মর্যাদা কমায় না, বরং বাড়ায়। আসওয়াদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী (সা.) ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি বলেন, ঘরের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ পরিবারের কাজকর্মে সহায়তা করতেন। আর নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য চলে যেতেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)
(আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৭৮)
সমস্যা সমাধানে প্রজ্ঞা ও ধৈর্য : দাম্পত্য জীবনে মতভেদ বা ভুল-বোঝাবুঝি হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা সমাধান করতে হবে ধৈর্যের সঙ্গে। নবী (সা.) রাগের সময়ও দোয়া করতেন এবং কোমল আচরণের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করতেন। তিনি কখনো কঠোরতা দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেননি।
(তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৪)
একে অপরের মনমানসিকতা বোঝা : এটা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। নবী (সা.) তাঁর স্ত্রীদের মনের অবস্থা বুঝতে পারতেন, কখন তারা খুশি, কখন দুঃখিত। এই বোঝাপড়া না থাকলে দাম্পত্য জীবনে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয় এবং অশান্তি বৃদ্ধি পায়।
(বুখারি, হাদিস : ৫২২৮)
সন্তুষ্টি ও তৃপ্তি : এগুলো দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত সুখ এনে দেয়। নবী (সা.)-এর ঘরে বিলাসিতা ছিল না; বরং ছিল অল্পে সন্তুষ্ট থাকার অনন্য দৃষ্টান্ত। অনেক সময় তাঁদের ঘরে পর্যাপ্ত খাবারও থাকত না, তবু তাঁরা ছিলেন সন্তুষ্ট ও শান্তিতে পরিপূর্ণ। বর্তমান ভোগবাদী সমাজে এই গুণটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
(মুসলিম, হাদিস : ৭৩৪২)
মহান আল্লাহ প্রতিটি পরিবারে শান্তি দান করুন। আমিন।