ঘরে যে রঙের আলোয় মন হবে শান্ত, দ্রুত আসবে ঘুম

শরীরের অনেক যত্নের কথা আমরা ভাবি, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ ভুলে যান মনের যত্নের বিষয়টি। এতে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মানসিক অস্থিরতা, মেজাজ হতে থাকে খিটখিটে। হতাশা, বিষণ্নতা, অনিদ্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন অনেকে।

অথচ সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, নিজের ঘরে খুব ছোট্ট একটি ব্যবস্থাপনাই শান্ত করে দিতে পারে আপনার অশান্ত জীবন।

প্রখ্যাত বাউল ও লোকসংগীত শিল্পী আবদুর রহমান বয়াতীর বিখ্যাত একটি গান ‘মন আমার দেহ ঘড়ি’। আধুনিক বিজ্ঞানেও প্রমাণ হয়েছে মানুষের শরীরে ভেতরে আছে অদৃশ্য এক ঘড়ি। সেই ঘড়ির টিকটিক করে চলার বৈজ্ঞানিক নাম ‘সার্কাডিয়ান রিদম’।

প্রায় ২৪ ঘণ্টার এই জৈবিক ছন্দ আমাদের ঘুম, জাগরণ, হরমোন নিঃসরণ, এমনকি মেজাজের ওঠানামাও নিয়ন্ত্রণ করে।

সূর্যের আলো ও অন্ধকারের পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে এই ছন্দ। বিভিন্ন কারণে এই ছন্দে পতন ঘটলেই মানুষের শরীর ও মন ভাঙতে শুরু করে। ঘুমের সমস্যা, বিষণ্নতা, এমনকি গুরুতর মানসিক অসুস্থতাও দেখা দিতে পারে।

নরওয়ের ট্রনহেইম শহরের সেন্ট ওলাভাস হসপিটালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের একটি দল এই ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ নিয়ন্ত্রণের বিশেষ এক পদ্ধতির খোঁজ পেয়েছেন।

হাসপাতালটিতে এখন ওষুধ বা থেরাপির পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে ‘আলোর রং’।

প্রথম দেখায় হাসপাতালের মনোরোগ ওয়ার্ডটিকে অন্য যেকোনো ওয়ার্ডের মতোই মনে হবে। তবে সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় দৃশ্য। জানালায় নেমে আসে বিশেষ ফিল্টার। সাদা আলো বদলে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে নরম ‘অ্যাম্বার আলো’, সহজ ভাষায় যাকে বলা যায় হালকা হলুদ ও কমলা রঙের মাঝামাঝি মধুরঙের এক আভা।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা সন্ধ্যার শুরুতেই অন্ধকার তাড়াতে ঘরে সাধারণত সাদা আলো জ্বালিয়ে দিই। এই আলোতে নীল তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি থাকে। এটি শরীরের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করে।

মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা, সন্ধ্যার পর সাধারণ বৈদ্যুতিক বাতি শরীরের ঘড়িকে বিভ্রান্ত করে। এর ফলে মেলাটোনিন নামের ঘুমের হরমোন কম নিঃসৃত হয়। মানুষ দেরি করে ঘুমাতে যায়, এমনকি ঘুমও ভালো হয় না। দীর্ঘদিন এমন অবস্থা চলতে থাকলে কারো কারো মানসিক সুস্থতার ওপরেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ধারণাটি যাচাই করতে গবেষকেরা ট্রনহেইম শহরের মনোরোগ ওয়ার্ডটিকে দুই ভাগ করেছিলেন। দুই অংশের কক্ষ, কর্মী ও সুবিধা সব ছিল একই রকম। পার্থক্য তৈরি করা হয় শুধু সন্ধ্যা নামার পরের আলোতে। এক ওয়ার্ডে সন্ধ্যা ৬টার পর নীল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো কমিয়ে দেওয়া হয়। জানালা ও ওয়ালেও নেমে আসে মধুরঙা স্ক্রিন। আর অন্য ওয়ার্ডে ছিল সাধারণ হাসপাতালের আলোর ব্যবস্থা।
গবেষণায় বেছে নেওয়া হয় ৪৭৬ জন রোগীকে।

তাদের অনেকে সাইকোসিস, তীব্র বিষণ্নতা, ম্যানিয়া এবং আত্মহত্যার চিন্তার মতো মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যে দেখা যায়, সাধারণ আলোর অংশের পরিবর্তে মধুরঙের আলোয় থাকা রোগীদের মানসিক অবস্থার বেশি উন্নতি হয়েছে। তাদের আক্রমণাত্মক আচরণও তুলনামূলকভাবে অনেক কমে গেছে।

গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং সেন্ট ওলাভাস হসপিটালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হোভার ক্যালেস্টাদ। তিনি মনে করছেন, আলোর রং বদলানোর মতো সহজ একটি পদক্ষেপেও মানসিক চিকিৎসার মান উন্নত হতে পারে।

মানসিক রোগের চিকিৎসায় আলো ব্যবহারের ধারণা অবশ্য নতুন নয়। তবে এত বড় পরিসরে এর আগে এমন গবেষণা খুব কম দেখা গেছে। গবেষণাটির ফল এরই মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী পিএলওএস মেডিসিনে প্রকাশ হয়ছে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল স্যোসাইটি ফর বাইপোলার ডিজঅর্ডারের সেমিনারেও উপস্থাপন করেছেন গবেষকরা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাতে মধুরঙের আলোয় মনের স্থিরতা ফিরে আসার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে আক্রমণাত্মক আচরণেও লাগাম পড়তে দেখা গেছে। এতে করে রোগীদের যত্ন নেওয়া অনেক সহজ হবে।

গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য মানসিক রোগের চিকিৎসার বাইরেও কাজে লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ঘুমের সমস্যা কাটাতে আলো-চিকিৎসা বিশেষভাবে কাজে লাগতে পারে। আবার বৃদ্ধাশ্রমের মতো জায়গাতেও ঘুমের উন্নতি ও আচরণগত সমস্যার কমাতে মধুরঙের আলো সাহায্য করতে পারে।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান