ঢাকার সাভারে বংশী নদীর জমিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর জমি উদ্ধার করলেও এই জমিগুলো দখলমুক্ত রাখতে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে উপজেলা প্রশাসন। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরপরই দখলদাররা রাতের আঁধারে এমনকি দিনের আলোতে আবারও দখল করতে উঠে-পড়ে লেগে যায়। জনবলের অভাব, উচ্ছেদের পর খালি হওয়া জমি ফাঁকা পড়ে থাকাসহ বেশ কিছু কারণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসনের সামনে। তবে এবার নদীর পাড় দখলমুক্ত রাখতে কাটাতাঁরের বেড়া দিল প্রশাসন।
এ ছাড়া পুনরায় দখলের অভিযোগ তুলেছেন কেউ কেউ। দখলমুক্তের প্রতিবেদন সঠিকভাবে আদালতে উপস্থাপন না হওয়ায় প্রশ্নের মুখে পড়ছে উপজেলা প্রশাসন, এমন দাবি জানালেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
শনিবার (১৫ জুলাই) সাভারের নামাবাজার এলাকার বংশী নদী ও নদীতীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা জমিগুলো কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। জানা যায়, এই জমিগুলোই এর আগের অভিযানের পর আবারও দখল করার চেষ্টা করলেও প্রশাসন তা ভেঙে দেয়।
এদিকে, দখলমুক্ত প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হওয়ার কথা জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সশরীরে তলব করেছেন উচ্চ আদালত।
সাভার উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, হাইকোর্টের নির্দেশে বংশী নদীর তীরে সাভার নামাবাজার অংশে ২০২২ সালের ২৮ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়। চার দিনের এই অভিযানে ২৮৬ জন দখলদারের স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানে নদীর চার একর জায়গা ও চার একর খাসজমি দখলমুক্ত করা হয়।
তার কয়েক মাস পর থেকে পুনরায় নদীর জমি দখলের পাঁয়তারা করতে থাকেন কিছু ব্যক্তি। প্রশাসনের নাম ভাঙিয়েও অনেকে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকাও উঠিয়েছেন। এ বিষয় জানতে পেরে আবারও অভিযান চালায় সাভার উপজেলা প্রশাসন। পরে দখলকারীদের হটাতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। এর আগে উপজেলা প্রশাসন ছাড়াও বিআইডাব্লিউটিএ ও আইন-শৃঙ্খলার বড় একটি দল অংশ নেয় এই অভিযানে।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, চার একর খাস জায়গা দখলমুক্তের পর জেলা প্রশাসন থেকে জায়গা ইজারা দেওয়া হচ্ছে। যেহেতেু জায়গাটি পুরনা একটি হাট-বাজার। সেই বিবেচনা রেখে এমন উদ্যোগ প্রশাসনের। ১৯৯৯ সাল থেকে খাস জায়গা, অর্থাৎ জেলা প্রশাসকের জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এটি। তবে গত জুন মাস থেকে জেলা প্রশাসন থেকে নিয়ম অনুসারে বরাদ্দ নিতে পারছেন পুরনো ব্যবসায়ীরা। সে ক্ষেত্রে গত ২৩ বছরের জরিমানা দিতে হবে। মূলত একজন ব্যবসায়ী আধা শতাংশ জায়গা বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ আছে। সে হিসাবে ২৩ বছরের জরিমানা হয় প্রায় এক লাখ ১৭ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত বরাদ্দ নিয়েছেন ৭৩ জন ব্যবসায়ী। যেখানে প্রায় ৮৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। অনেকগুলো প্রক্রিয়াধীন।
স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল আক্তার বলেন, এখানে আগে দোকান ছিল অনেক। বাজারের একটা অংশ আর কি। সেখানে গত বছর উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দেখলাম সব ভেঙে দিয়ে গেল। অনেক মানুষ এসেছিল। পরে দেখি আস্তে আস্তে আবারও দোকানপাট ওঠা শুরু হলো। আবার দেখি এখন কিছুই নেই। শুনেছি এগুলো নাকি নদীর জায়গা, খাসজমিও নাকি আছে। যে যেভাবে পারছে দখল করছে। আর পুলিশসহ লোকজন এসে ভেঙে দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কামরুজ্জামান বলেন, নদী তো সবার প্রয়োজন। নদী এভাবে দখল হয়ে গেলে তা তো আমাদের জন্যই খারাপ। এখন তো দেখছি পুরো জমি কাঁটাতার দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এভাবে ফেলে রাখলে তো দেখা যাবে আবারও কেউ কাঁটাতার কেটে জায়গা দখল করে বসে থাকবে। আমরা চাই স্থায়ী সমাধান হোক। কেউ যাতে আর দখল না করতে পারে।
এ বিষয়ে সাভার নদী পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক বলেন, আমরা চাই যেহেতু উচ্ছেদ হয়েছে। জায়গাটি খোলা থাকুক। বাজারের জন্য ঘাট বা বাগান করা যেতে পারে। এখানে দোকান বা কিছু করা হলে, ভবিষ্যতে সেটি স্থায়ী রূপ নিতে পারে।
সাভারের বংশী নদীর অবৈধ দখলের বিষয়ে দেওয়া প্রতিবেদনে অসন্তুষ্ট হয়ে সাভারের ইউএনও মাজহারুল ইসলামকে আগামী ১৮ জুলাই তলব করেছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম বলেন, নদীর অংশ এখনো মানুষ দখল করার চেষ্টা করে, তবে বেশি না। গত সপ্তাহে তিনজনকে পেয়েছিলাম। তাদের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমরা যে রিপোর্ট পাঠিয়েছি সেটা আদালতের কাছে ঠিকমতো উপস্থাপন করা হয়নি, হয়তো এ কারণেই আদালত সন্তুষ্ট হননি। নদীর পাড়ের জায়গাটা তো এখন ভরাট আছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত এটি খনন করে পানি না হবে ততক্ষণ কেউ যদি একটা বাঁশ রাখে, কেউ যদি একটা ছোট জিনিসপত্র রাখে ওইটাকেই অনেকে দখল মনে করছেন। এমন তথ্য দিচ্ছে অনেকে।
তিনি আরো বলেন, নদীর জায়গা তো বরাদ্দের কোনো সুযোগ নেই। সেটা আমরা কাঁটাতার দিয়ে আলাদা করলাম। পানি উন্নয়ন বোর্ড আছে, সাভার পৌরসভা আছে, বিআইডাব্লিউটিএ আছে- তারা নদী খনন করতে পারবে। ওইটা তো আর উপজেলা প্রশাসন করতে পারবে না, এখতিয়ারও নেই। সেই লজিস্টিক বা ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট নেওয়ার দায়িত্ব ইউএনওর না।
জেলা প্রশাসনের চার একর খাসজমির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খাসজমি সরকারি নিয়মে এক বছর মেয়াদি হাট-বাজারের চান্দিনা ভিটি হিসেবে বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে।