সারা দেশের অন্যান্য জেলার মতো পর্যটন নগরী কক্সবাজারেও সংক্রামক ব্যাধি হাম ছড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে অবাক হবার মতো বিষয় হচ্ছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত জানুয়ারি থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত ১১ সপ্তাহে ৮ হাজার ৭৫৯ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে।
অথচ গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে হাম উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার ৩৫৫ জন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জানুয়ারি থেকে হামের প্রকোপ বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে।
তবে মৃত্যু তেমন নেই। মাত্র একজন শিশু মৃত্যুর তথ্য মিলেছে।
অপরদিকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে আরো ১১ জন শিশু। এ নিয়ে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেল পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৩১ জন হাম আক্রান্ত শিশু।
গত ৩ দিনে মারা গেছে ৪ শিশু। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে যে, জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেই রাখা হচ্ছে হাম উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদেরও। হাম উপসর্গের যেসব শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হচ্ছে তাদের নিয়ে অন্যান্য শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে এমন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। তবে নতুন করে একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হবে বলে জানিয়েছেন, কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম।
চিকিৎসকরা বলছেন, গ্রাম-গঞ্জের তুলনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বসতির ঘনত্ব বেশি হবার কারণেই সংক্রমক ব্যধিটি ছড়াচ্ছে দ্রুতগতিতে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিকিৎসা কার্যক্রমে কর্মরত কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের (আরআরআরসি) চিকিৎসক তোহা ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন-‘ তবে এত ব্যাপক আক্রান্ত হলেও ক্যাম্পগুলোতে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তেমন নেই। ক্যাম্পে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর ব্যাপকভাবে তদারকির কারণেই আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার তেমন নেই।’
এদিকে কক্সবাজার জেলা শহরসহ আশেপাশের এলাকায় এ রোগের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় জনমনে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক, দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। ২৫০ শয্যার কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
চিকিৎসক ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১১ জন শিশু।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় মোট ৮১ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। হঠাৎ করে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মাঝে। অনেক অভিভাবক মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদান কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নতুন করে টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলার সিভিল সার্জন অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার শহরের ৩টি এলাকা, মহেশখালী, টেকনাফ ও রামুর কয়েকটি এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকায় ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ নজরদারি বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘হাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ইতিমধ্যে জেলার প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত টিকা মজুদ রয়েছে এবং টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত আছে।’
তিনি আরো জানান, যেসব এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি সেখানে বিশেষ নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।