২৪ ঘণ্টায় হামে ৪ মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৬৮৫ স্কুল বন্ধ চেয়ে রিট

দেশে সংক্রামক রোগ হামের প্রকোপ বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ৬৮৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, একই সময়ে ২৬ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০৯ জনে এবং নিশ্চিত রোগী ৫৮৫ জন।

এ সময় পর্যন্ত মোট ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকিৎসা নিয়ে ইতোমধ্যে ১,৯৩০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি ও সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, ফলে দেশজুড়ে জনস্বাস্থ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর।

চট্টগ্রাম : নগরীতেও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে হামের সংক্রমণ। গতকাল বৃহস্পতিবারও নতুন করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৭ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। একই দিনে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুই শিশুর

মৃত্যুতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে গত দু’দিনে চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই মূলত হামের প্রধান শিকার। সচেতনতার অভাব এবং টিকাদান কর্মসূচি সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে অনেক শিশুই এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

রাজশাহী : রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বেড়েই চলেছে হামের প্রকোপ। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ১৩২ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সন্দেহভাজন হামের রোগী ভর্তি হয়েছেন ২০ জন। এই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত হয়ে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ জন।

বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সাংবাদিকদের এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালটির মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে হাম রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১৭ জন হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে। এদের মধ্যে ১১ জন ছেলে ও ৬ জন মেয়ে রয়েছেন। আর ৫৮ জন হাম রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। এ পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে ৩ জনকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামের লক্ষণ নিয়ে আরও ২৬টি শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে এখানে ৭৯টি শিশু চিকিৎসাধীন। গত দুদিনে ২৬টি শিশু ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে। ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১৭২ শিশু। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৯৪ শিশু। মৃত্যু হয়েছে ৫ শিশুর। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৭৯ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে আরও ১০টি শিশু।

খুলনা : হামের সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের মধ্যে নতুন ভেরিয়েন্টের হাম দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এই নতুন ভেরিয়েন্ট শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। চার বছরের ব্যবধানে দেওয়ার কথা থাকা হাম প্রতিরোধক টিকা ২০২২ সালে নিয়মিতভাবে কার্যকর না হওয়ায় টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২৯ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত), খুলনা বিভাগে মোট ৭৮ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে ২৬ জন রোগীর দেহে হামের জীবাণু নিশ্চিত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে কুষ্টিয়া জেলায়, যেখানে ৬৩ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ জন চিকিৎসাধীন কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়া যশোরে ছয়জন, খুলনা জেলায় তিনজন, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরাতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। স্বস্তির বিষয় হলো, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও নড়াইলে এখন পর্যন্ত কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্ত ওয়ার্ড, চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের অধীনে থাকা হাসপাতালগুলোয় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার : হামে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় হামে মোট তিন শিশুর মৃত্যু হলো। গতকাল ভোরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ডেডিকেটেড হাম ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেসিন নামের ৯ মাস বয়সী শিশুর মৃত্যু হয়। জেসিন মহেশখালীর ছোট মহেশখালী এলাকার বাসিন্দা নাসিরের কন্যা।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম জানান, সর্বশেষ মৃত শিশুটি হাম ছাড়াও অন্যান্য রোগে ভুগছিল। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত ছিল।

এদিকে জেলায় আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে হামের প্রকোপ। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে বর্তমানে ৪২ শিশু ভর্তি রয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতালে আরও ৫ শিশু চিকিৎসাধীন আছে। সব মিলিয়ে দুই হাসপাতালে ভর্তি শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে হামের আক্রান্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট মাসের শিশু সায়ফাল মৃত্যুবরণ করেছে এবং আক্রান্ত হয়ে আরও ১৩ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। নিহত সায়ফাল সদর উপজেলার হাতিলা গ্রামের সোহেল রানার ছেলে। বুধবার দিনগত রাত প্রায় ৩টার দিকে শিশুটি মারা যায়।

ভোলা : হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে ভোলার দুই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৫ শিশু। যাদের মধ্যে তজুমদ্দিনে একজন এবং ভোলার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ১৪ জন। আক্রান্ত শিশুদের নমুনা সংগ্রহ করে শিশু ওয়ার্ডের আইসোলেশন ইউনিটে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

স্কুল বন্ধ চেয়ে হাইকোর্টে রিট

হামের প্রকোপ না কমা পর্যন্ত স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে রিটে সম্প্রতি দেশে হামের কারণে ৪৭ শিশু মৃত্যুর ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন চাওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট করা হয়। আগামী সপ্তাহে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে রিট আবেদনটির ওপর শুনানি হতে পারে।

এর আগে গত বুধবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের শিশুদের হামের টিকার ব্যবস্থা করতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠান মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া। রিটে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে।