ভয়াবহ হচ্ছে হাম, প্রতিরোধে করণীয়

২০২৬ সালে বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরু থেকে দেশে হাম আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই ৫ বছরের কম বয়সি। রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আক্রান্তের হার বেশি। শুধুমাত্র মার্চ মাস পর্যন্তই কয়েক শতাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৪ জন বলে জানা গেছে। এছাড়া সম্ভাব্য আক্রান্তের সংখ্যা ৫৮০০ জন, যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

একজন হামে আক্রান্ত রোগী ১৮ জনকে আক্রান্ত করতে পারে । ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, হাম সাধারণত ১০২–১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বর দিয়ে শুরু হয়। সঙ্গে থাকে কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং মুখের ভেতরে কপলিক স্পট নামক সাদা দাগ। ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের একটি বড় অংশ অন্যান্য জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং কখনো কখনো এনসেফালাইটিস। অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে এই জটিলতার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি, যা মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

হাম রোগের বিস্তার বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হিসাবে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পূর্ববর্তী লক্ষ্য অনুযায়ী ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় এই হার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। বিশেষ করে, কোভিড মহামারীর সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে টিকা সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, শহরের বস্তি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা বড় একটি ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ সৃষ্টি করে। ফলে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে।

প্রতিরোধের ক্ষেত্রে হাম টিকা অত্যন্ত কার্যকর এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। একটি পূর্ণ ডোজ সিরিজ ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে সক্ষম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেক শিশুই নির্ধারিত দুই ডোজ সম্পন্ন করতে পারেনি। সাধারণত প্রতি চার বছর অন্তর একটি বিশেষ হাম টিকা কর্মসূচি পরিচালিত হয়, যা সর্বশেষ ২০২০ সালে পরিচালিত হয়েছিল। ২০২৪ সালে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে টিকা কর্মসূচি পরিচালনা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া, ভিটামিন-এ এবং কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানোর কর্মসূচি নিয়মিত না হওয়ায় শিশুদের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব পড়েছে। এটিও হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পুনরায় জোরালোভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন, বিশেষ করে ‘ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন’ কর্মসূচির মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকা প্রদান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সচেতনতা বৃদ্ধিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অভিভাবক এখনও হামকে একটি সাধারণ রোগ হিসেবে দেখেন, যা স্বাভাবিকভাবে সেরে যায়। এই ধারণাটি কেবল ভুলই নয়, ভয়াবহও। বাস্তবে এটি একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা দেওয়া, আক্রান্ত শিশুকে যথাসম্ভব আলাদা রাখা, পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে প্রতিটি পরিবারে নিশ্চিত করা জরুরি।

পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে টিকাদান কাভারেজ কমপক্ষে ৯৫ শতাংশে উন্নীত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজর দেওয়া এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য।

লেখক: ডা. ফাহ্মিদা জাবীন

সিনিয়র কনসালটেন্ট

পেডিয়াট্রিক ও নিওনেটোলজি বিভাগ

এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা